সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়নঃ উপাদান, নীতি, প্রক্রিয়া ও প্রয়োগক্ষেত্র

সমষ্টির ধারণা (Concept of Community)

মানুষ স্বভাবতই দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করে। দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে গিয়ে মানুষ একে অপরের সাথে নানা সম্পর্কে আবদ্ধ হয়। আর এভাবেই গড়ে ওঠে জনসমষ্টি। সাধারণভাবে সমষ্টি বলতে কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় বসবাসরত একদল মানুষকে বুঝায়, যারা কতিপয় মৌলিক ও অভিন্ন স্বার্থ রক্ষায় পরস্পর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় লিপ্ত হয় এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সমজাতীয় ধ্যান ধারণা পোষণ করে।

সমষ্টির সংজ্ঞায় ম্যাকাইভার ও পেজ বলেন, যখন কোনো ক্ষুদ্র বা বৃহৎ গোষ্ঠীর অন্তুর্ভুক্ত সদস্যরা এমনভাবে বসবাস করে যে, তারা বিশেষ কোনো স্বার্থের অংশীদার না হয়ে স্বাভাবিক জীবনের মৌলিক বিষয়সমূহে অংশগ্রহণ করে তখন আমরা ঐ গোষ্ঠীকে সমষ্টি বলে থাকি।

গফুর ও মান্নান এর মতে, জনসমষ্টি হলো একদল লোকের সমষ্টি, যারা একই ভৌগোলিক অঞ্চলে বসবাস করে এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও গ্রহণযোগ্যতা বিদ্যমান এবং কতিপয় বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে তারা অন্য প্রতিবেশি গোষ্ঠী থেকে আলাদা।

সুতরাং সমষ্টি বলতে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় বসবাসরত এমন একদল মানুষকে বোঝায়, যারা সাধারণ স্বার্থকে কেন্দ্র করে একত্রিত হয়ে বসবাস করে এবং যারা সমষ্টির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কতিপয় সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে, যা তাদের মধ্যে সাধারণ বন্ধন সৃষ্টি করে এবং ‘আমরা বোধ জাগিয়ে তোলে।

Community Organization and Community Development

সমষ্টির প্রকৃতি (Nature of Community)

প্রত্যকটি সমষ্টির নিজস্ব কিছু রীতিনীতি, মূল্যবোধ, আদর্শ ও সংস্কৃতি থাকে, যা ঐ সমষ্টির সকল সদস্য মেনে চলে। এসব আদর্শ ও মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে স্বজাত্যবোধ। সমষ্টির মূল্য বৈশিষ্ট্য বা প্রকৃতি হলো দুটি। যথা: ১। নির্দিষ্ট অঞ্চল ও ২। স্বজাত্যবোধ।

১। নির্দিষ্ট অঞ্চল : প্রত্যেকটি সম্প্রদায় বা সমষ্টি একটি সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় বসবাস করে। এক্ষেত্রে বসবাসকারী প্রত্যেকটি সদস্যের মধ্যে পারস্পরিক পরিচিত ও সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। এরা বিভিন্ন প্রয়োজনে একে অন্যের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ও দ্রব্যাদি আদানপ্রদান করে থাকে। নিজেদের প্রয়োজনের তাগিদে তারা ঐ এলাকায় নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে পারস্পরিক আন্তক্রিয়া সম্পাদন করে থাকে।

২। স্বজাত্যবোধ : নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাসের ক্ষেত্রে সমষ্টি নির্দিষ্ট কিছু আদর্শ ও মূল্যবোধ অনুশীলন করে থাকে। আর এই অনুশীলনের প্রেক্ষিতে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে স্বজাত্যবোধ। সমষ্টির প্রতিটি সদস্য এই স্বজাত্যবোধের কারণে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে যথাযথ ভূমিকা পালন করে থাকে। এর ফলে পারস্পরিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়। সমষ্টির এই স্বজাত্যবোধ তিনটি আলাদা অনুভূতির সংমিশ্রণে গড়ে ওঠে। যথা:

ক) আমরাবোধ : স্বজাত্যবোধ থেকে সমষ্টির সদস্যদের মধ্যে ‘আমরাবোধ’ বা We Feeling তৈরি হয়, যা সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি করে সমষ্টির উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথ সুগম করে দেয়।

খ) ভূমিকা পালন মনোভাব : স্বজাত্যবোধ ও আমরাবোধের কারণে সমষ্টির সদস্যদের মধ্যে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হয়। আর এ কারণে সমষ্টির প্রতিটি সদস্য তার যথাযথ ভূমিকা পালনে সক্রিয় হয়। ফলে সমষ্টির সদস্যদের মধ্যে ঘনিষ্ট আত্মিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।

গ) নির্ভরতা মনোভাব : সমষ্টির সদস্যদের পারস্পরিক পরিচিতি, সহযোগিতা, স্বজাত্যবোধ ও আমরা বোধ সৃষ্টির কারণে পরস্পরের প্রয়োজন ও চাহিদা পূরণে এক অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতার প্রেক্ষিতে একে অন্যের প্রয়োজনসমূহ পূরণে এগিয়ে আসে।

দলবদ্ধ জীবনযাপন করা মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম। দলবদ্ধ জীবনযাপনের মধ্য দিয়েই মূলত সমষ্টির উদ্ভব হয়। সমষ্টি হলো এমন একটি জনসম্প্রদায় যারা একই রীতিনীতি, একই ধরনের আচার ব্যবহার, একই ঐতিহ্য, একই সামাজিক আদর্শ ও স্বার্থে উদ্বুদ্ধ এবং একই সামাজিক সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় একত্রে বসবাস করে এবং জীবনযাপনের সাধারণ উদ্দেশ্যসমূহ পূরণ করে। প্রতিটি সম্প্রদায়ের কিছু নির্দিষ্ট রীতিনীতি, আদর্শ ও মূল্যবোধ রয়েছে, যা সম্প্রদায়ের সদস্যরা মেনে চলে। আর এসব মূল্যবোধ ও আদর্শের উপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে স্বজাত্যবোধ।

সমষ্টি সংগঠন (Community Organization)

পেশাদার সমাজকর্মের তৃতীয় মৌলিক পদ্ধতি হলো সমষ্টি সংগঠন। তবে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের সমষ্টিগত সমস্যা মোকাবিলার লক্ষ্যে সমষ্টি উন্নয়ন প্রক্রিয়া করা হচ্ছে। এ বিষয়টি বিবেচনা করে বর্তমান গ্রন্থে সমাজকর্মের তৃতীয় মৌলিক পদ্ধতিকে সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়ন নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে ।

সাধারণভাবে সুপরিকল্পিত ও সুচিন্তিতভাবে কোনো নির্দিষ্ট জনসমষ্টির সমাজকল্যাণমূলক চাহিদা ও সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের প্রক্রিয়াকে সমষ্টি সংগঠন বলা হয়। অর্থাৎ সমষ্টির সম্পদের মাধ্যমে কীভাবে সমষ্টির চাহিদা পূরণ করা যায়, তার সুচিন্তিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নই হলো সমষ্টি সংগঠন।

ম্যারি জি. রস বলেন, সমষ্টি সংগঠন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যা সমষ্টির চাহিদা বা উদ্দেশ্যসমূহ চিহ্নিত করে, চাহিদা বা উদ্দেশ্যসমূহকে অগ্রাধিকার প্রদান করে এবং এসব চাহিদা বা উদ্দেশ্য অর্জনে কাজ করার আগ্রহ ও বিশ্বাস সৃষ্টি করে এবং সম্ভাব্য সম্পদ খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় কর্মপন্থা গ্রহণ করে এবং এসব কার্য সম্পাদন করতে গিয়ে সমষ্টিতে সমবায়িক ও সহযোগিতামূলক মনোভাব ও প্রথার বিকাশ ঘটায় এবং সম্প্রসারণ করে।

ইংরেজিতে পড়ুনঃ Community Organization in Social Work

ডব্লিউ. এ. ফ্রিডল্যান্ডারের মতে, সমষ্টি সংগঠন এমন একটি সমাজকর্ম প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো ভৌগোলিক এলাকার সমাজকল্যাণমূলক প্রয়োজন ও সম্পদের মধ্যে ফলপ্রসূ সামঞ্জস্যবিধান করা হয়।

সূতরাং বলা যায় যে, সমষ্টি সংগঠন এমন একটি সমাজকর্ম প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সমষ্টির জনগণের বিভিন্ন কল্যাণমূলক চাহিদাসমূহ চিহ্নিত করে সমষ্টির সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে চাহিদা পূরণের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।

সমষ্টি উন্নয়ন (Community Development)

সাধারণত অনুন্নত ও স্থবির জনসমষ্টির আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের জন্য এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে মূলত এ পদ্ধতির প্রচলন শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে এ পদ্ধতিটি শুধুমাত্র অনুন্নত দেশগুলোর উন্নয়নের জন্য প্রয়োগ করা হতো। বর্তমানে পদ্ধতিটি উন্নত দেশের অনুন্নত অঞ্চলসমূহের উন্নয়নেও ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।

জাতিসংঘের মতে, সমষ্টি উন্নয়ন এমন এক ধরনের পদ্ধতি, যার দ্বারা সমাজের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতি সাধনের জন্য জনসাধারণের কার্যাবলীকে সরকারি কার্যাবলীর সাথে সংযুক্ত করা হয় এবং বিভিন্ন জনসমষ্টিকে জাতীয় উন্নয়নের সাথে সংযুক্ত করে তাদেরকে জাতীয় উন্নতিতে ভূমিকা রাখার জন্য সক্ষম করে তোলা হয়।

ভারত সরকারের India 1982 নামক গ্রন্থে বলা হয়েছে, সমষ্টি উন্নয়ন হচ্ছে গ্রামবাসী কর্তৃক পরিকল্পিত ও বাস্তবায়িত আত্মসাহায্যমূলক কর্মসূচি, যাতে সরকার কেবল কারিগরি নির্দেশনা ও আর্থিক সহায়তা দেন। এর উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত পর্যায়ে আত্মনির্ভরতার উন্নয়ন এবং জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান। যেমনÑ সমবায় সমিতির মাধ্যমে সমষ্টিগত চিন্তাচেতনা ও যৌথ কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা।

সূতরাং বলা যায়, কোনো সমষ্টির আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের মাধ্যমে সরকারি-বেরসকারি, আর্থিক ও কারিগরি সাহায্য, সমষ্টির স্থানীয় উদ্যোগ এবং সম্পদ ও সামর্থ্যরে সর্বোত্তম ব্যবহারের প্রক্রিয়াই হলো সমষ্টি উন্নয়ন।

ইংরেজিতে পড়ুনঃ Community Development in Social Work

সমষ্টির বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলা এবং সমষ্টির সার্বিক উন্নয়নের জন্য পেশাদার সমাজকমের্র যে তৃতীয় মৌলিক পদ্বতি প্রয়োগ করা হয় সেটি হলো সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়ন। সমষ্টি সংগঠন হচ্ছে সমাজকর্মের একটি মৌলিক পদ্ধতি ও সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সমষ্টির জনগণের বিভিন্ন চাহিদা ও সম্পদের মাঝে সামঞ্জস্যবিধানের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থার মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে প্রয়োজনীয় সকল ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। অন্যদিকে সমষ্টি উন্নয়ন হলো, এমন একটি পদ্ধতি যার দ্বারা সমষ্টির সার্বিক উন্নয়নের জন্য জনসাধারণের কার্যাবলীকে সরকারি কার্যাবলীর সাথে সংযুক্ত করা হয় এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে জাতীয় উন্নয়নের সাথে সংযুক্ত করে তাদেরকে জাতীয় উন্নতিতে ভূমিকা রাখার জন্য সক্ষম করে তোলা হয়।

সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়নের উপাদান (Components of Community Organization and Development)

সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়নের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি বিশ্লেষণ করলে এর পাঁচটি উপাদান পাওয়া যায়। যথা: ক) জনসমষ্টি, খ) জনসমষ্টির চাহিদা ও প্রয়োজন, গ) প্রতিষ্ঠান, ঘ) পেশাদার প্রতিনিধি এবং ঙ) প্রক্রিয়া। নিচে এগুলো আলোচনা করা হলো :

ক) সমষ্টি : সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়নের মৌল উপাদান হলো জনসমষ্টি। একদল লোক যখন সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় সাধারণ স্বার্থ রক্ষায় পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে আন্তক্রিয়ায় লিপ্ত হয় তখন ঐ দলকে বলা হয় জনসমষ্টি।

জনসমষ্টির সুনির্দিষ্ট কিছু একক স্বার্থ, আদর্শ, মূল্যবোধ বিদ্যমান থাকে যা ঐ সমষ্টির সকল সদস্য যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করে। এ প্রেক্ষিতে তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধন সৃষ্টি হয়। সমষ্টির মধ্যে যেসব বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয় তা হলো: সাধারণ স্বার্থ ও সাদৃশ্যপূর্ণ জীবনধারা, সামাজিক বন্ধন, আত্মীয়তা ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ইত্যাদি।

খ) সমষ্টির চাহিদা ও প্রয়োজন : সমষ্টির প্রয়োজন ও চাহিদাকে কেন্দ্র করে সমষ্টি সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়ন আবর্তিত হয়। সমষ্টির অভাব, অক্ষমতা ও ব্যর্থতা থেকেই তাদের চাহিদা ও প্রয়োজন উদ্ভব হয়। সমষ্টির জনগণের অনুভূত চাহিদা ও প্রয়োজন মূলত সমষ্টির চাহিদা ও প্রয়োজন। তবে এই চাহিদা ও প্রয়োজন অবশ্যই সমষ্টির সকলের জন্য কল্যাণকর হতে হবে। সমষ্টির চাহিদা ও প্রয়োজন বহুমুখী ও বিচিত্র হয়ে থাকে। এ চাহিদা ও প্রয়োজন অনেক সময় সমষ্টির সদস্যদের ব্যক্তিগত ও দলীয় চাহিদার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়।

গ) প্রতিষ্ঠান : সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়নের অপরিহার্য উপাদান হলো প্রতিষ্ঠান। সমষ্টির সমস্যার সমাধান, উন্নয়ন প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের হয়ে থাকে। সেবাকর্মের প্রকৃতি অনুযায়ী এ প্রতিষ্ঠানগুলো একমুখী ও বহুমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেবা প্রদান করে থাকে। তবে প্রতিষ্ঠানের সফলতা নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের গতিময়তার উপর। এ ছাড়াও প্রতিষ্ঠানের ধরন, প্রকৃতি, কার্যাবলী, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ প্রভৃতির উপর প্রতিষ্ঠানের সফলতা নির্ভর করে।

ঘ) পেশাদার প্রতিনিধি : পেশাদার সমাজকর্মী সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়নের একটি অপরিহার্য উপাদান। সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়নে পেশাদার প্রতিনিধি বা সমাজকর্মী সাধারণত সমষ্টি সংগঠক বা উন্নয়নকর্মী হিসেবে সমধিক পরিচিত।

সেবা প্রতিষ্ঠান ও সমষ্টির চাহিদা ও সমস্যার প্রেক্ষিতে একজন সমাজকর্মী কখনো সমন্বয়কারী, কখনো সক্ষমকারী, কখনো উপদেষ্টা, কখনো সাহায্যকারী, কখনো প্রশিক্ষক আবার কখনো সংগঠকের ভূমিকা পালন করে থাকেন। তবে একজন সমাজকর্মীর সেবাপ্রক্রিয়ার সফলতা নির্ভর করে তার যোগ্যতা ও দক্ষতার উপর। একজন পেশাদার সমাজকর্মীর মধ্যে যে সকল বিষয়ে দক্ষতা থাকা দরকার তা হলোÑ সমষ্টির বিভিন্ন দল ও ব্যক্তির সাথে ইতিবাচক যোগাযোগ স্থাপন, সমষ্টির চাহিদা ও প্রয়োজনের গঠনমূলক অনুধ্যান ও বিশ্লেষণ, সমষ্টির সম্পদ চিহ্নিতকরণ ও তার ব্যবহার, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও কর্মসূচি গ্রহণ, সমষ্টির কর্মকা-ে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষমতা ইত্যাদি।

ঙ) প্রক্রিয়া : সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়নের অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সমাজকর্ম প্রক্রিয়া। প্রক্রিয়া বলতে সমষ্টির সমস্যার সমাধান বা উন্নয়নে ব্যবহৃত প্রক্রিয়াকে বোঝানো হয়েছে। সমষ্টির চাহিদা ও প্রয়োজন সম্পর্কে যথাযথ অনুধ্যান বা অনুসন্ধানের মাধ্যমে যথাযথ প্রয়োজন নিরূপণ করে বাস্তবমুখী সেবাদানের মাধ্যমে সমষ্টির উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার প্রচেষ্টা চালানো হয়। এক্ষেত্রে সমষ্টির উন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ যথাযথ কার্যকর কি না বা কতটুকু সফলতা পাওয়া গেল তা নিরূপণের জন্য মূল্যায়ন জরুরি। মূলত সমষ্টির চাহিদা সম্পর্কিত অনুধ্যান, তথ্য সংগ্রহ, সমস্যা নির্ণয়, সমাধান পরিকল্পনা, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন এগুলোর সমন্বিত রূপ হলো সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়ন প্রক্রিয়া।

একদল পেশাদার সমাজকর্মী দ্বারা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় একটি নির্দিষ্ট সমষ্টির চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়ন পরিচালিত হয়। সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়ন মূলত পাঁচটি উপাদানের সমষ্টি। উপাদানগুলো হলো: ক) সমষ্টি, খ) সমষ্টির চাহিদা ও প্রয়োজন, গ) প্রতিষ্ঠান, ঘ) পেশাদার প্রতিনিধি এবং ঙ) প্রক্রিয়া।

সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়নের উপাদান নীতিমালা (Principles of Community Organization and Development)

সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়নের সমন্বিত নীতিমালা সংক্ষিপ্তাকারে আলোচনা করা হলো :

১. সমষ্টি স্বাতন্ত্রীকরণ নীতি : প্রতিটি সমষ্টি তাদের সম্পদ, সামর্থ্য, দলীয় সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক, আদর্শ, মূল্যবোধের ভিত্তিতে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তাদের চাহিদা ও সমস্যাবলী ভিন্নতর হয়। এক্ষেত্রে সমষ্টির চাহিদাপূরণ ও সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সমষ্টিকে স্বতন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করে সমাধান প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

২. আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার নীতি : এই নীতির আওতায় সমষ্টির সমস্যার সমাধান ও চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে সমষ্টির উপর কোনোরূপ সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দিয়ে পরামর্শ ও নির্দেশনা প্রদান করে নিজেদের সম্পদ ও সামর্থ্যরে সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে সমষ্টিকে সক্ষম ও আত্মনির্ভরশীল করে তোলা হয়।

৩. অগ্রাধিকারভিত্তিক অনুভূত প্রয়োজন নীতি : এ নীতির আলোকে সমষ্টির অনুভূত চাহিদা ও প্রয়োজনসমূহকে শ্রেণিবিন্যাস করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজন পূরণের প্রচেষ্টা চালানো হয়। অর্থাৎ একাধিক সমস্যার মধ্যে সমষ্টির কল্যাণে সর্বপ্রথম জরুরি সমস্যার সমাধান করা হয়।

৪. নমনীয় সাংগঠনিক কাঠামো নীতি : সমষ্টির চাহিদা ও সমস্যা পরিবর্তনশীল । তাই সমষ্টির সমস্যার প্রকৃতি অনুযায়ী সমাধান ব্যবস্থা প্রদানে প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কাঠামো পরির্বতনশীল হতে হবে।

৫. সমান সুযোগের নীতি : এ নীতির আওতায় একদিকে সমষ্টির প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে সমষ্টির প্রতিটি সদস্যের স্বার্থ সমানভাবে নিশ্চিত করা হয়। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি সমষ্টি যেন সমান সুযোগ পায় তা নিশ্চিত করা হয়।

৬. কর্মসূচির সমন্বয় সাধন নীতি : এই নীতিটির আলোকে সমষ্টির চাহিদা পূরণ ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে সমষ্টির সম্পদ, কর্মসূচি এবং সমষ্টির অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলীর মধ্যে সমন্বয় সাধন করা হয়। 

৭. যোগাযোগ নীতি : যোগাযোগ নীতি অনুযায়ী সমষ্টির মধ্যকার সকল দল ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন করা হয়। এক্ষেত্রে যোগাযোগের দ্বিমুখী নীতি অনুসৃত হয়। অর্থাৎ সমাজকর্মীর পক্ষ থেকে দল ও প্রতিষ্ঠানের সাথে আবার দল ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সমাজকর্মীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা হয়।

৮. মর্যাদার স্বীকৃতিদান নীতি : এ নীতির আওতায় সমাজকর্মী সমষ্টি ও সমষ্টির সকল সদস্যের মূল্য ও মর্যাদার স্বীকৃতি প্রদান করে। এ ধরনের স্বীকৃতি সমষ্টি ও সমষ্টির সুপ্ত ক্ষমতার বিকাশ ঘটিয়ে সমষ্টির সামগ্রিক উন্নয়নে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।

৯. সকলের অংশগ্রহণ নীতি : সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো সমষ্টির সমস্যার সমাধান প্রক্রিয়ায় সকলের সমান অংশগ্রহণ। এ নীতির আওতায় সমষ্টির অনুভূত চাহিদাপূরণ, সমস্যার সমাধান ব্যবস্থা এবং সমষ্টির সামগ্রিক উন্নয়নে সমষ্টির সকল সদস্যের স্বতঃর্স্ফুত ও পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিতের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা হয়।

১০. সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন নীতি : এ নীতির আলোকে সমষ্টির অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ সকল দিকের সুসম উন্নয়নের প্রতি গুরুত্বরোপ করা হয়। অর্থাৎ সমষ্টির মধ্যে বিদ্যমান সকল বিষয়ের সমান উন্নয়নে গুরুত্ব প্রদান করা হয়।

১১. সমাজকর্মীর পেশাগত দায়িত্ব সচেতনতার নীতি : সমষ্টির ক্ষেত্রে সমাজকর্মী একাধারে একজন সংগঠক, সমন্বয়কারী, সক্ষমকারী, প্রশিক্ষক, পরামর্শকের ভূমিকা পালন করে থাকেন। এক্ষেত্রে সমাজকর্মীকে তার পেশাগত জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে মূল্যবোধ নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনে সচেতনতার সাথে কাজ করতে হয়।

১২. সামাজিক ঐক্য ও সহযোগিতার নীতি : এ নীতির আলোকে সমষ্টির সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সমষ্টির সদস্যের মধ্যে ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দেয়া হয়। কেননা পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্কের ভিত্তিতে সমষ্টির সদস্যরা তাদের স্ব স্ব ভূমিকা ও দায়িত্ব পালনে সক্রিয় হয়, যা সমষ্টির সামগ্রিক উন্নয়নে একান্ত প্রয়োজন।

সমষ্টির বিভিন্ন সমস্যার মোকাবিলা এবং সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়নের উদ্ভব হয়েছে। সমষ্টির জনগণের সুপ্ত ক্ষমতার বিকাশ, তাদের মধ্যে স্বাবলম্বী মনোভাব গঠন ও অভ্যন্তরীণ সামর্থ্যরে পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন করে তাদের আত্মনির্ভরশীল জনগোষ্ঠীতে পরিণত করাই সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়নের মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সুনির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। সেগুলো হলো: ১) সমষ্টির

স্বাতন্ত্রীকরণ নীতি, ২) আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার নীতি, ৩) অগ্রাধিকারভিত্তিক অনুভূত প্রয়োজন নীতি, ৪) নমনীয় সাংগঠনিক কাঠামো নীতি, ৫) সমান সুযোগের নীতি, ৬) কর্মসূচির সমন্বয় সাধন নীতি, ৭) যোগাযোগ নীতি, ৮) মর্যাদার স্বীকৃতিদান নীতি, ৯) সকলের সমান অংশগ্রহণ নীতি, ১০) সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন নীতি, ১১) সমাজকর্মীর পেশাগত দায়িত্ব সচেতনতার নীতি এবং ১২) সামাজিক ঐক্য ও সহযোগিতা নীতি।

সমষ্টি সংগঠন প্রক্রিয়া (Process of Community Organization) 

সমষ্টি সংগঠন পদ্ধতি প্রয়োগে বিভিন্ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়ে থাকে। মারি জি. রসের মতে, সমষ্টি সংগঠন প্রক্রিয়াসমূহ হলো: ১. শোষণমুখী প্রক্রিয়া, ২. সংস্কারমুখী প্রক্রিয়া, ৩. পরিকল্পনামুখী প্রক্রিয়া, ৪. উদ্ভাবনামূলক প্রক্রিয়া এবং ৫. চিকিৎসামুখী প্রক্রিয়া। সমষ্টি সংগঠন প্রক্রিয়াসমূহ সংক্ষেপ বর্ণনা করা হলো:

১. শোষণমুখী প্রক্রিয়া : মূলত চরম পশ্চাদমুখী জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় এ ধরনের সমষ্টির অস্তিত্ব না থাকায় এ প্রক্রিয়ার অনুশীলন হয় না।

২. সংস্কারমুখী প্রক্রিয়া : নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে পরিবর্তনের জন্য এ প্রক্রিয়া ব্যবহৃত হয়। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ প্রচেষ্টা চালাতে পারে। এজন্য কর্মসূচি প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও জনমত সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালানো হয়। এ প্রক্রিয়ায় সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে বিধায় দ্রুত জনমত গঠন ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায় এবং চাহিদা পূরণ বা সমস্যার দ্রুত ও সহজতর সমাধান সম্ভব হয়। এটি একটি জনপ্রিয় প্রক্রিয়া বিধায় সহজেই সাফল্য লাভ করা সম্ভব হয়। তবে এ প্রক্রিয়ায় বহুমুখী সমস্যার সমাধান সম্ভব হয় না। সুসম উন্নয়নের পক্ষে এ প্রক্রিয়া তেমন কার্যকর নয় এবং কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে একক চিন্তার ফলে কার্যক্রমে গতিশীলতা বা নতুনত্ব পাওয়া যায় না।

৩. পরিকল্পনামুখী প্রক্রিয়া : এ প্রক্রিয়ায় দলীয়ভাবে প্রচেষ্টা চালানো হয় এবং সমষ্টির বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় সাধন করা হয়। এক্ষেত্রে সকল কর্মসূচি সমানভাবে গুরুত্ব পায়। সকলের জন্য সমষ্টিগত ও বহুমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় সমষ্টির সম্পদ ও সামর্থ্য ব্যবহারের মাধ্যমে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। সমষ্টির সার্বিক দিক বিবেচনা করে পরিকল্পনা ও কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয় এবং বাস্তবসম্মত উত্তম পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেয়া হয়। ফলে একই সাথে অনেকগুলো কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে সুসম উন্নয়ন সম্ভব হয়।

৪. উদ্ভাবনমূলক প্রক্রিয়া : এ প্রক্রিয়ায় সমষ্টির সদস্যদেরকে সমস্যা সমাধানে সক্ষম করে তোলার ব্যবস্থা করা হয়। অনেক সময় সমষ্টিতে নতুন নতুন সমস্যা দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে সমষ্টির সদস্যদের নিজস্ব ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন হয়। সমষ্টির সম্পদ, সামর্থ্য ব্যবহার করে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা চালানো হয়।

৫. চিকিৎসামুখী প্রক্রিয়া : অতি অগ্রবর্তী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি কার্যকর। থেরাপি বা চিকিৎসামূলক সেবা প্রদানের মাধ্যমে এ সমষ্টির সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা চালানো হয়। তবে বর্তমান সমাজব্যবস্থায় এ ধরনের জনসমষ্টির অস্তিত্ব না থাকায় এর ব্যবহার হয় না বললেই চলে।

সমষ্টি সংগঠনের উপরিউক্ত প্রক্রিয়াসমূহ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কতগুলোা স্তর বা পর্যায় অতিক্রম করতে হয়। যেমন:

ক) তথ্য অনুসন্ধান : সরাসরি জরিপ বা ঘটনা অনুধ্যানের মাধ্যমে সমষ্টির বিদ্যমান সমস্যা বা চাহিদা, সম্পদ ও সামর্থ্য সম্পর্কিত তথ্য অনুসন্ধান করা হয়।

খ) বিশ্লেষণ বা সমস্যা নির্ণয় : অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যাবলী বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমষ্টির সমস্যার গতি-প্রকৃতি ও কারণ সম্পর্কে জানা সম্ভব হয়।

গ) পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন : সমষ্টির সমস্যা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করে সমস্যা বা চাহিদার গতি-প্রকৃতি অনুযায়ী পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয় এবং যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।

ঘ) মূল্যায়ন : কর্মসূচি বাস্তবায়নের পর কর্মসূচি স্বার্থকতা বিচার করার জন্য মূল্যায়ন করা হয়। মূলত পরিকল্পনা পর্যায় থেকে শুরু করে শেষ অবধি এ মূল্যায়ন কার্যক্রম চলতে থাকে।

ইংরেজিতে পড়ুনঃ Techniques in Community Social Work Practice

সমষ্টি উন্নয়ন প্রক্রিয়া (Process of Community Development) 

সমষ্টির বৈশিষ্ট্য, আদর্শ, মূল্যবোধ এবং সমষ্টির জনগণের অভ্যাস, রুচি, কার্যপ্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে সমষ্টি বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে সমষ্টির চাহিদা ও প্রয়োজনসমূহ বিচিত্র হয়। চাহিদা ও প্রয়োজনের সাথে সঙ্গতি রেখেপ্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়। মারি জি. রসের   সমষ্টি উন্নয়নের প্রক্রিয়া তিনটি। যথা: ১. একক কার্যপ্রক্রিয়া ২. বহুমুখী কার্যপ্রক্রিয়া এবং ৩. আন্তসম্পদ প্রক্রিয়া। নিচে এগুলো সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করা হলো:

১. একক কার্যপ্রক্রিয়া : সমষ্টির উন্নয়নে একক কার্যপ্রক্রিয়ায় সমষ্টির বাইরে থেকে আগত বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিত্ব সমষ্টির সমস্যা নির্ণয় এবং তার সমাধানে পরিকল্পনা প্রণয়ন, কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে থাকেন। এক্ষেত্রে উন্নয়ন পরিকল্পনায় সমষ্টির জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং বিভিন্ন পদ্ধতি ও কৌশল প্রয়োগ করে সদস্যদের মাঝে সচেতনতাবোধ জাগিয়ে তোলা হয়। সমষ্টির জনগণ যাতে উন্নয়নের সকল সুযোগ-সুবিধা পেতে পারে তার ব্যবস্থা করেন।

সমষ্টি উন্নয়নের এ প্রক্রিয়ায় অতি দ্রুত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। কেননা এখানে বিশেষজ্ঞের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকে। ফলে এ প্রক্রিয়ায় সময় কম লাগে, অর্থের সাশ্রয় হয় এবং কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ থাকে না।

তবে এ প্রক্রিয়ায় সমষ্টির একটি মাত্র সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় বিধায় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া পাওয়া যায় না। এটি সম্পূর্ণভাবে বিশেষজ্ঞের যোগ্যতা ও দক্ষতার উপর নির্ভরশীল হওয়ায় অনেক সময় বিশেষজ্ঞের দক্ষতার অভাবে এ প্রক্রিয়া সফল হয়না। সমষ্টির সদস্যগণ এ সম্পর্কে তেমন অবগত না থাকায় এ প্রক্রিয়ার ফলাফল বেশিদিন স্থায়ী হয় না। তবে সহজ ও দ্রুত উপায়ে সমষ্টির উন্নয়নে এ প্রক্রিয়া অত্যন্ত কার্যকর ও ফলপ্রসূ।

২. বহুমুখী কার্যপ্রক্রিয়া : এ প্রক্রিয়ায় সমষ্টির জনগণের বহুমুখী প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে একাধিক বিশেষজ্ঞ নিয়োজিত থাকার পাশাপাশি সমষ্টির জনগণের অন্তর্ভুক্তি থাকে। এ প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হলো সমষ্টির জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় কর্মসূচি গ্রহণ করে সমষ্টিকে উন্নত এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা। এ প্রক্রিয়ায় জনগণের অন্তর্ভূক্তি থাকে বিধায় তারা সক্রিয় ভূমিকা পালনে আগ্রহী হয়। একই সঙ্গে একাধিক সমস্যার সমান্তরাল সমাধানের মাধ্যমে দ্রুত কার্যকর উন্নয়ন সম্ভব হয়। তবে এ প্রক্রিয়া সময় সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল হওয়াতে বাজেট ঘাটতির সম্ভাবনা থাকে। একাধিক বিশেষজ্ঞ থাকায় মত পার্থক্য দেখা দেয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রক্রিয়াটি বহুমুখী হওয়ায় অনেক সময় সমস্যার সকল দিকে সমানভাবে গুরুত্ব দেয়া সম্ভব হয় না। তবে প্রক্রিয়াটি অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা আনয়নে অত্যন্ত কার্যকর।

৩. আন্তসম্পদ প্রক্রিয়া : আন্তসম্পদ প্রক্রিয়ায় সমষ্টির সদস্যরা নিজেরা তাদের সমস্যাবলী চিহ্নিত করে সমস্যা মোকাবিলায় পরিকল্পনা প্রণয়ন ও কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সমষ্টির সম্পদ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এ প্রক্রিয়ায় সমষ্টির সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হয়। সমষ্টির জনগণের যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পায়। জনগণের সুপ্ত ক্ষমতার বিকাশ ঘটে এবং সমষ্টির জনগণের মধ্যে স্বাবলম্বী মনোভাব জাগ্রত হয়। তবে এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের সরাসরি হস্তক্ষেপ না থাকায় কর্মসূচি পরিচালনায় ত্রুটি দেখা দিতে পারে। আবার সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক সুদৃঢ় না হলে কার্যক্রমের গতি ঝিমিয়ে পড়তে পারে। তবে সমষ্টির সদস্যদের মধ্যে আত্মনির্ভরশীলতা সৃষ্টিতে এ প্রক্রিয়া অত্যন্ত কার্যকর। সমষ্টি উন্নয়নের এ প্রক্রিয়াসমূহ সম্পাদনের ক্ষেত্রে কতগুলো ধাপ অনুসরণ করতে হয়। যেমন:

ক) সমষ্টি জরিপ : সমষ্টির গঠন, চাহিদা, প্রয়োজন, সমস্যা, সম্পদ, সামর্থ্য প্রভৃতি সম্পর্কে যথাযথ তথ্য সংগ্রহের জন্য জরিপ কার্য চালানো হয়। এটি উন্নয়ন প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ।

খ) সমস্যা নির্ণয় : এ পর্যায়ে সমস্যা নির্ণয় করা হয়। জরিপের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমষ্টির সমস্যার স্বরূপ, কারণ, প্রকৃতি ইত্যাদি নির্ণয় করা হয়।

গ) পরিকল্পনা প্রণয়ন : এ পর্যায়ে সমষ্টির সমস্যা নির্ণয়ের প্রেক্ষিতে সমষ্টির সম্পদ ও সামর্থ্যরে উপর ভিত্তি করে যথাযথ কার্যকর ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা ও কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হয়। এক্ষেত্রে সমস্যা সমাধান প্রক্রিয়া সমষ্টির জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়।

ঘ) মূল্যায়ন : প্রণীত কর্মসূচির বাস্তবায়ন এবং সফলতা ও ব্যর্থতা নিরূপণের জন্য মূল্যায়ন করা হয়। কর্মসূচি প্রণয়নের শুরু থেকে শেষ অবধি এ মূল্যায়ন চলতে থাকে।

প্রতিটি সমষ্টির গঠন, প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য, আদর্শ, মূল্যবোধ এবং সমষ্টির জনগণের অভ্যাস, রুচি ও কর্মপ্রক্রিয়ার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। সমষ্টির প্রকৃতি অনুযায়ী চাহিদা, প্রয়োজন বা সমস্যা আলাদা ও বিচিত্রমুখী হয়। এই ভিন্ন ও বিচিত্রমুখী চাহিদা বা প্রয়োজন পূরণ এবং সমস্যার সমাধানে বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। সমষ্টি উন্নয়নের সমস্যা সমাধান প্রক্রিয়াসমূহ হলো: ১) একক কার্যপ্রক্রিয়া, ২) বহুমুখী কার্যপ্রক্রিয়া ও ৩) আন্তঃসম্পদ প্রক্রিয়া।

অন্যদিকে সমষ্টি সংগঠনের ক্ষেত্রে যেসব প্রক্রিয়া প্রয়োগ করা হয় সেগুলো হলো: ১) শোষণমুখী প্রক্রিয়া, ২) সংস্কারমূলক প্রক্রিয়া, ৩) পরিকল্পনামুখী প্রক্রিয়া, ৪) উদ্ভাবনমূলক প্রক্রিয়া ও ৫) চিকিৎসামূলক প্রক্রিয়া।

সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়নের মধ্যে সাদৃশ্য

ক) সমষ্টি সংগঠন 

সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়নের মধ্যে পার্থক্য

ক) সমষ্টি সংগঠন হল সামাজিক কাজের একটি পদ্ধতি, যখন সমষ্টি উন্নয়ন হল একটি পরিকল্পিত পরিবর্তন সাধনের একটি প্রোগ্রাম।

খ) সমষ্টি সংগঠন প্রক্রিয়ার উপর জোর দেয়, কিন্তু সমষ্টি উন্নয়ন শেষ বা লক্ষ্যের উপর জোর দেয়।

গ) সমষ্টি সংগঠকরা প্রাথমিকভাবে সমাজকর্মী হয়ে থাকে এবং সামাজিক পরিবর্তনের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। কিন্তু সমষ্টি উন্নয়ন কর্মীরা কৃষি বিশেষজ্ঞ, পশুচিকিৎসা বিশেষজ্ঞ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞ সহ অন্যান্য পেশার হতে পারেন।

ঘ) সমষ্টি সংগঠন সাধারণত সময় সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের গতি অনুসারে ধাপে ধাপে অর্জিত হয়। কিন্তু সমষ্টি  উন্নয়ন সময়সীমাবদ্ধ, এবং উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য সময় নির্দিষ্ট করা হয়।

ঙ) সমষ্টি সংগঠনে জনগণের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। কিন্তু সমষ্টি উন্নয়নে জনগণের উন্নয়ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

চ) সমষ্টি সংস্থাগুলিতে, সরকার এবং বহিরাগত সংস্থাগুলি দ্বারা প্রদত্ত সহায়তা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ নয়৷ কিন্তু সমষ্টি উন্নয়নে সরকার বা অন্যান্য সংস্থার বাহ্যিক সাহায্য প্রয়োজন বলে মনে করা হয়।

ছ) সমষ্টি সংগঠন হল সামাজিক কাজের একটি পদ্ধতি, এবং এই পদ্ধতিটি অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সমষ্টি সংগঠনের বিপরীতে, সমষ্টি উন্নয়নকে একটি প্রক্রিয়া, একটি পদ্ধতি, একটি কর্মসূচি এবং পরিকল্পিত পরিবর্তনের আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

জ) সকল ক্ষেত্রে সমষ্টি সংগঠন ব্যবহৃত হয়। তবুও, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির জন্য সমষ্টি উন্নয়ন সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল।

ঝ) সমষ্টি সংগঠনে, জনগণের দ্বারা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, তবে সমষ্টির উন্নয়ন প্রধানত সরকারের অন্তর্গত একটি বহিরাগত সংস্থা দ্বারা পরিচালিত হয়।

ঞ) সমষ্টির সংগঠনগুলিতে, লোকেরা তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য সংগঠিত হয়, কিন্তু সমষ্টির উন্নয়নে, লক্ষ্যগুলি অর্জন করতে হয় এবং এই উদ্দেশ্যেই মানুষ সংগঠিত হয়।

ট) সমষ্টি সংগঠন সকল সম্প্রদায়ের জন্য সর্বজনীন। তবুও, এলাকাটি গ্রামীণ, শহুরে বা উপজাতীয় কিনা এবং এলাকার অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে সমষ্টির উন্নয়ন কর্মসূচী ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে আলাদা হয়।

ইংরেজিতে পড়ুনঃ Community Organization and Development: Differences and Scope

সমষ্টি সংগঠনের প্রয়োগক্ষেত্র (Fields of Community Organization)

সমাজকর্মের মৌলিক পদ্ধতি হিসেবে সমষ্টি সংগঠন বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সমষ্টির কল্যাণে প্রয়োগ করা হয়। তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের শহরাঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন চাহিদা পূরণ ও সমস্যা সমাধানে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে শহরাঞ্চলের সমষ্টি সংগঠনের প্রয়োগক্ষেত্রসমূহ আলোচনা করা হলো :

১. সমষ্টির সমস্যা নির্ণয় : বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ন্যায় শহরাঞ্চলেও নানাবিধ জটিল ও বহুমুখী সমস্যা বিদ্যমান। দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট এ সমস্যাবলী চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে সমষ্টি সংগঠন প্রয়োগ করা যেতে পারে। চিহ্নিত সমস্যাসমূহের ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সমষ্টি সংগঠন পদ্ধতি প্রয়োগ করে সমস্যাগুলোর কারণ, ধরন, প্রকৃতি ও প্রভাব নির্ণয় করা যেতে পারে। 

২. স্থানীয় সম্পদ চিহ্নিতকরণ : শহরাঞ্চলে বিদ্যমান সমস্যাবলী নির্ণয়ের মাধ্যমে সমাধান প্রদানের ক্ষেত্রে সম্পদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্থানীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার ছাড়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য অনুসন্ধানের ম্যাধমে স্থানীয় সম্পদ চিহ্নিত করে তা যথাযথ ব্যবহারে সমষ্টি সংগঠন প্রয়োগ করা যেতে পারে।

৩. সংস্থার কার্যাবলীর সমন্বয় সাধন : শহর সমষ্টির সমস্যা সমাধানে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাসমূহের কার্যাবলীর মধ্যে সমন্বয় সাধন অতীব জরুরি। শুধু তাই নয়, সরকারি ও বেসরকারি কার্যক্রমের সাথে স্থানীয় সমষ্টির কার্যক্রমও সমন্বয় করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সমাজকর্মের সমষ্টি সংগঠন পদ্ধতির প্রয়োগ অত্যন্ত ফলপ্রসূ।

৪. দ্বন্দ্ব দূরীকরণ : সমষ্টির সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে একাধারে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে অনুদান গ্রহণ করা হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বিরাজমান দ্বন্দ্ব সংঘাত দূর করে প্রতিষ্ঠানের সম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে সমষ্টি সংগঠনের প্রয়োগ অতীব জরুরি।

৫. জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ : সমষ্টির সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সমষ্টির সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক তৈরি আবশ্যক। এক্ষেত্রে সমষ্টির সদস্যদের মধ্যে দায়িত্ব ও কর্তব্য সচেতন করে তোলা প্রয়োজন। দায়িত্ব-কর্তব্য সচেতন সদস্যরা তাদের যথাযথ ভূমিকা পালনের মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রমে যথার্থ ভূমিকা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে সমষ্টি সংগঠন পদ্ধতি প্রয়োগ করে সমষ্টির সদস্যদের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা যায়।

৬. সম্পদের সদ্ব্যবহার : সম্পদের সদ্ব্যবহার সমষ্টি সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমষ্টির জনগোষ্ঠীর বিনোদনমূলক কাজের জন্য পার্ক, খেলার মাঠ, শিশুদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টিসহ এলাকায় বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান ইত্যাদি ক্ষেত্রে নিজস্ব সম্পদের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করে সমষ্টির উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে সমষ্টি সংগঠন প্রয়োগ করা যেতে পারে।

সমষ্টি উন্নয়নের প্রয়োগক্ষেত্র (Fields of Community Development)

পেশাদার সমাজকর্মের মৌলিক পদ্ধতি সমষ্টি উন্নয়ন সাধারণত অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহের সমষ্টির উন্নয়ন এবং উন্নত বিশ্বের অনুন্নত অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক চাহিদা বা প্রয়োজন পূরণের মাধ্যমে সার্বিক উন্নয়ন সাধনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি। এ পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে সমষ্টির জনগণকে তাদের নিজস্ব সমস্যা সমাধানে সচেতন করে তোলা হয় যাতে তারা নিজেদের প্রয়োজন পূরণে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে আগ্রহী হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে যে সকল ক্ষেত্রে সমষ্টি উন্নয়ন পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায় সেগুলো হলো :

১. পল্লী উন্নয়ন : বাংলাদেশের অধিকাংশই লোক গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করে। পল্লীর এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে অনগ্রসর। এই অনগ্রসরতা কাটাতে তাদের পর্যাপ্ত সম্পদ ও সামর্থ্য নেই। এক্ষেত্রে সমষ্টি উন্নয়ন পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে উন্নতমানের বীজ ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ, সমবায়ভিত্তিক কৃষি খামার প্রতিষ্ঠা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা যায়।

২. যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন : সমষ্টির সামগ্রিক উন্নয়নের অন্যতম নির্দেশক হলো যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নতুন নতুন রাস্তাঘাট নির্মাণ, পুরাতন রাস্তাঘাটের সংস্কার, পুল ও কালভার্ট নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।

৩. কার্যকর স্বাস্থ্য কর্মসূচি প্রবর্তন : গ্রামীণ ও শহরের অনুন্নত জনগোষ্ঠীর মধ্যে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব পরিলক্ষিত হয়। সমষ্টি উন্নয়নের মাধ্যমে এ জনগোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে খাদ্য, পুষ্টি, মা ও শিশু স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনা সৃষ্টি, বিদ্যালয় ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তাদেরকে বিভিন্ন উৎপাদনমুখী কর্মকা-ের সাথে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। 

৪. আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি : বাংলাদেশে শ্রমশক্তির বৃদ্ধির তুলনায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ায় বেকারত্ব ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত কাঁচামালনির্ভর কুটিরশিল্প স্থাপন, হাঁস-মুরগী ও পশুপালন, মৎস্য খামার, সবজি উৎপাদনসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সমষ্টি উন্নয়ন পদ্ধতি বিশেষভাবে উপযোগী।

৫. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ : বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো অধিকহারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি। পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কুফল সম্পর্কে সচেতন করে তুলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে

বিভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণে উদ্যোগী করে তোলা যেতে পারে। এছাড়া পারিবারিক পরিবেশের মধ্যে সহযোগিতা, সহানুভূতি ও সহমর্মিতার সম্পর্ক সৃষ্টি করে পরিবার ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল করে তুলতে সমষ্টি উন্নয়ন পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে।

৬. শিক্ষা সম্প্রসারণ : বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ নিরক্ষর। এই জনগোষ্ঠীকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে শিক্ষার প্রচলন একান্ত আবশ্যক। এজন্য আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি বয়ষ্ক শিক্ষা, নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রচলনে সমষ্টি উন্নয়ন পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে।

৭. গৃহায়ন : বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অন্যতম সমস্যা গৃহহীনতা। স্বল্প ব্যয়ে গৃহ নির্মাণ প্রকল্প ও সমবায়ভিত্তিক গৃহনির্মাণ কার্যক্রমের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। এছাড়া বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন দুর্যোগ ও জরুরি পরিস্থিতিতে সেবা প্রদানের মাধ্যমে জনগণের দুর্দশা লাঘব এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমষ্টি উন্নয়ন পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায়।

৮. স্থানীয় নেতৃত্বের বিকাশ : স্থানীয় পর্যায়ে যথাযথ নেতৃত্ব সৃষ্টি ও নেতৃত্বের বিকাশের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে উদ্বৃদ্ধ করে সমষ্টির সম্পদ ও সামর্থ্যরে যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং সমষ্টির নিজস্ব চাহিদা পূরণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও তা যথাযথ পরিচালনা ও যুগোপযোগী কর্মসূচি প্রণয়নে সমষ্টি উন্নয়ন প্রয়োগ করা যায়।

৯. সম্পদের সদ্ব্যবহার ও আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন : গ্রামীণ জনসমষ্টির বস্তুগত ও অবস্তুগত অনেক সম্পদ থাকে যা অব্যবহৃত থেকে যায়। সমষ্টি উন্নয়ন পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে সমষ্টির এ সম্পদসমূহ যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে সমষ্টিকে স্বাবলম্বী করে তোলা যায়। এছাড়া গ্রামীণ এলাকার জনগণের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক সৃষ্টির ক্ষেত্রে পারস্পরিক পরিচিতি ও বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে সমষ্টি উন্নয়ন প্রয়োগ করা যায়।

১০. স্বাস্থ্য ও পুষ্টিহীনতা দূরীকরণ : মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং পুষ্টি সম্পর্কে যথাযথ ধারণা ও শিক্ষাদান, রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, মাতৃত্বকল্যাণ কেন্দ্র স্থাপন প্রভৃতির মাধ্যমে সমষ্টির জনগণের স্বাস্থ্য ও পুষ্টিহীনতা দূর করতে সমষ্টি উন্নয়ন পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায়।

এছাড়াও সমষ্টির জনগণের বিভিন্ন চিত্তবিনোদনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, সামাজিক শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বজায় রাখা, সামাজিক কুসংস্কার ও অজ্ঞতা দূরীকরণে সচেতনতা সৃষ্টি, সমন্বিত উপায়ে সমস্যার সমাধান, প্রচলিত প্রথা, রীতিনীতির সংস্কার সাধন প্রভৃতি ক্ষেত্রে সমষ্টি উন্নয়ন পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে।

সমাজকর্মের মৌলিক পদ্ধতি হিসেবে সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়ন চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণ এবং সমস্যার কার্যকর সমাধানের মাধ্যমে সমষ্টির সামগ্রিক উন্নয়ন ধারাকে অব্যাহত রাখতে অত্যন্ত ফলপ্রসূ একটি পদ্ধতি। সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়ন আবার সমষ্টির অবস্থানের প্রেক্ষিতে প্রয়োগের দিক থেকে দু’ধরনের। যথা: সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়ন। অনুন্নত বা উন্নয়নশীল বিশ্ব এবং উন্নত বিশ্বের অনুন্নত এলাকায় সমষ্টি উন্নয়ন পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। আবার উন্নত বিশ্ব এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের শহরাঞ্চলে সাধারনত সমষ্টি সংগঠন পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সমষ্টি উন্নয়নের প্রয়োগক্ষেত্র হলো: ১) পল্লী উন্নয়ন, ২) যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ৩) কার্যকর স্বাস্থ্য কর্মসূচি প্রবর্তন, ৪) আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, ৫) জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, ৬) শিক্ষা সম্প্রসারণ, ৭) গৃহায়ন, ৮) স্থানীয় নেতৃত্বের বিকাশ, ৯) স্বাবলম্বন, ১০) স্বাস্থ্য ও পুষ্টিহীনতা দূরীকরণ ইত্যাদি। 

অন্যদিকে বাংলাদেশের শহর সমষ্টিতে সমষ্টি সংগঠনের প্রয়োগক্ষেত্রসমূহ হলো: ১) সমষ্টির সমস্যা নির্ণয়, ২) স্থানীয় সম্পদ চিহ্নিতকরণ, ৩) সংস্থার কার্যাবলীর মধ্যে সমন্বয় সাধান, ৪) সংস্থার দ্বন্দ্ব দূরীকরণ, ৫) জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও ৬) সমষ্টির সম্পদের যথাযথ ব্যবহার।

সমাজকর্মের মৌলিক পদ্ধতির মধ্যে আন্তসম্পর্ক (Interrelationships among Basic Methods of Social Work)

সমাজকর্ম একটি বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও দক্ষতানির্ভর পেশা। সমাজকর্ম হলো ব্যক্তি, দল ও সমষ্টির সামাজিক ভূমিকা পালন ক্ষমতা বৃদ্ধি ও পুনরুদ্ধারে সাহায্য করার এবং এই লক্ষ্যার্জনে অনুকূল সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টির একটি প্রক্রিয়া। সমাজকর্মের সাহায্য প্রক্রিয়ার মৌলিক পদ্ধতি তিনটি। যথা: ব্যক্তি সমাজকর্ম, দল সমাজকর্ম এবং সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি সমাজকর্ম । সঙ্গত কারণে এই তিনটি পদ্ধতির মৌল একক হলো ব্যক্তি। এজন্য সমাজকর্মের এই মৌলিক পদ্ধতি তিনটির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। ব্যক্তি কখনো একক, কখনো দলের সদস্য আবার কখনো সে সমষ্টির অংশীদার।

একারণে ব্যক্তিকে সেবা দিতে গিয়ে দল ও সমষ্টিকে সেবা দিতে হয়। অন্যদিকে দলকে সেবা দিতে গিয়ে ব্যক্তি ও সমষ্টিকে এবং সমষ্টিকে সেবা দিতে গিয়ে ব্যক্তি ও দলকে সেবাপ্রদান করতে হয়। অর্থাৎ সমাজকর্মের মৌলিক পদ্ধতিসমূহের প্রয়োগের ক্ষেত্রে সবসময়ই কেন্দ্রে অবস্থান করে ব্যক্তি। সমাজকর্মের মৌলিক পদ্ধতিগুলোর মধ্যকার আন্তসম্পর্ক আলোচনা করা হলো :

প্রথমত : ব্যক্তির সমস্যা সমাধানে প্রয়োগ করা হয় ব্যক্তি সমাজকর্ম। কিন্তু ব্যক্তি যেহেতু দল ও সমষ্টির একক, সেহেতু ব্যক্তি সমাজকর্ম প্রয়োগের সাথে সাথে ব্যক্তির সমস্যার যথাযথ সমাধানে দল সমাজকর্ম ও সমষ্টি সমাজকর্মের প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

দ্বিতীয়ত : ব্যক্তি সমাজকর্মের উদ্দেশ্য হলো ব্যক্তিকে তার সামাজিক ভূমিকা পালন ক্ষমতার পুনরুদ্ধারে সহায়তা করার লক্ষ্যে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা। এক্ষেত্রে ব্যক্তির সমস্যা সমাধানের সাথে সাথে দল ও সমষ্টিতে ব্যক্তি যাতে তার যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারে সেক্ষেত্রেও তাকে সক্ষম করে তোলা হয়। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র ব্যক্তিকেন্দ্রিক সেবাব্যবস্থাই যথেষ্ট নয়, দল ও সমষ্টিকেন্দ্রিক সেবা প্রদানের মাধ্যমে ব্যক্তিকে তার যথাযথ সামাজিক ভূমিকা পালন ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করা হয়।

তৃতীয়ত : দল সমাজকর্ম সাধারণত দলকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। গঠনমূলক দলীয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দলের সদস্যদের সামাজিক ভূমিকা পালনে সহায়তা করা দল সমাজকর্মের মূল লক্ষ্য। কিন্তু দল গঠিত হয় কিছু ব্যক্তিকে নিয়ে।

আবার দল হলো সমষ্টির একক। সূতরাং দলের উদ্দেশ্য অর্জন করতে গিয়ে ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিতে হয়। আবার দল যেহেতু সমষ্টির একক সেহেতু সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সমষ্টির দিকটিও যথাযথ বিবেচনায় আনতে হবে।

চতুর্থত : সমষ্টি সমাজকর্মের মূল উদ্দেশ্য হলো বস্তুগত ও অবস্তুগত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে সমষ্টির জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। সমষ্টি হলো কতিপয় দল ও অনেকগুলো ব্যক্তির সমষ্টি। সূতরাং সমষ্টির পূর্ণাঙ্গ কল্যাণ সাধন দল ও ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে সম্ভব নয়।

পঞ্চমত : সমাজকর্মের কতগুলো সাধারণ নীতিমালা রয়েছে। যেমনÑ ব্যক্তি মর্যাদার স্বীকৃতি, আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার, সকলের জন্য সমান সুযোগ, স্বাতন্ত্রীকরণ, সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, সম্পদের সদ্ব্যবহার ইত্যাদি। সমাজকর্মের এই নীতিসমূহ সকল মৌলিক পদ্ধতির ক্ষেত্রে সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োগ করা হয়।

ষষ্ঠত : ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমস্যা যেমন একক কোনো কারণে সৃষ্টি হয় না, তেমনি সমস্যার সমাধানও একক পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়। ব্যক্তির সমস্যা সমাধানের জন্য যেমন সমষ্টির সম্পদ ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। তেমনি দলের অন্যান্য

সদস্যদের সাহায্যও প্রয়োজন হয়। সুতরাং বলা যায়, ব্যক্তি সমাজকর্ম, দল সমাজকর্ম এবং সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়ন অনুশীলন ও প্রয়োগ একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। 

ব্যক্তি হলো সমাজকর্ম অনুশীলনের মৌলিক একক। তাই সমষ্টি কেন্দ্রিক হোক কিংবা দলকেন্দ্রিক সমাজকর্ম অনুশীলন করতে যাওয়া হোক না কেন ব্যক্তি সমাজকর্ম ব্যতীত সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। ব্যক্তি হলো সমাজকর্ম অনুশীলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। ব্যক্তি সমাজকর্ম অনুশীলন করতে গেলে ব্যক্তির সর্বোচ্চ ক্ষমতার বিকাশ ও নিজস্ব সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে দল ও সমষ্টির প্রয়োজন অপরিহার্য। আবার দল সমাজকর্ম অনুশীলন করতে গিয়ে দলীয় পরিবেশে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সেবা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে প্রয়োজন দেখা দেয় সমষ্টির সম্পদেরও। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, সমাজকর্মের মৌলিক পদ্ধতিগুলো পরস্পর ঘনিষ্টভাবে সম্পৃক্ত। 

বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও পদ্ধতিনির্ভর পেশা হলো সমাজকর্ম। সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি, দল ও সমষ্টির সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে তাদের সামাজিক ভূমিকা পালন ক্ষমতা বৃদ্ধি ও পুনরুদ্ধারে সাহায্য করা এবং এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির প্রক্রিয়া হলো সমাজকর্ম। সমাজকর্মের কার্যক্রম ত্রিমাত্রিক। যথা: ব্যক্তিকেন্দ্রিক, দলকেন্দ্রিক ও সমষ্টিকেন্দ্রিক।

সঙ্গত কারণে সমাজকর্মের মৌলিক পদ্ধতি তিনটি যথা: ব্যক্তি সমাজকর্ম, দল সমাজকর্ম এবং সমষ্টি সংগঠন ও সমষ্টি উন্নয়ন। সমাজকর্মের এই তিনটি পদ্ধতির মধ্যেকার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ট। ব্যক্তি কখনো একক, কখনো দলের সদস্য আবার কখনো সমষ্টির অংশীদার। একারণে ব্যক্তিকে সেবা দিতে গিয়ে দল ও সমষ্টিকে সেবা দিতে হয়। অন্যদিকে দলকে সেবা দিতে গিয়ে ব্যক্তি ও সমষ্টিকে এবং সমষ্টিকে সেবা দিতে গিয়ে ব্যক্তি ও দলকে সেবা দিতে হয়। সুতরাং দেখা যায় যে, সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিটি পদ্ধতি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত।

Next Post Previous Post
1 Comments
  • Anonymous
    Anonymous September 2, 2022 at 4:14:00 PM GMT+6

    অসাধারণ লিখেছেন।

Add Comment
comment url