ভাই(রাস) করোনা কী আদৌ মানবসৃষ্ট নাকি ঈশ্বরের আশীর্বাদ?


আমরা সবাই এখন কমবেশি কোভিড-১৯ সম্পর্কে জানি। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ভাইরাস সহজে আমাদের ছেড়ে যাবে না, আপন ভাইয়ের মতো এরে আগলে রেখেই আমাদের বসবাস করতে হবে। অন্যদিকে, নোভেল করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সমূহ কোন সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছেনা। বিভিন্ন দেশে নানা রকম মেডিসিন দিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করা হচ্ছে, তবে প্লাজমা থেরাপি এখন বেশ জনপ্রিয়। 


যেখানে, পৃথিবীর প্রায় ২১৫ টি দেশের ৬ মিলিয়ন ও বাংলাদেশের প্রায় অর্ধ-লক্ষ মানুষ যখন করোনায় আক্রান্ত এবং সারাবিশ্ব করোনা ভয়ে আতংকিত; ঠিক তখনি, কিছু মানুষ, দল, গোষ্ঠি বিশেষত এন্টি-ভ্যাকসিনেশান মুভমেন্ট এর সদস্য ও ধর্মীয় গৌড়ামির কিছু মানুষ নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সন্ধান পেয়েছেন। এই করোনার বর্তমান অবস্থা হলো-আপন ভাইয়ের সাথে গৃহযুদ্ধ যেন শেষই হচ্ছেনা। এরা হলো বাংলাদেশের বিসিএস প্রত্যাশী নবীনদের মতো! হাও মাও কাও ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাই। একদম হুজুগে আদমি। 


কিন্তু তাদের মতাবাদ একদম ফেলনা না, যেমন Kingsman the Secret Service (2014) হলিউড মুভিতে দেখি "If we don't reduce our population ourselves, there's only one of two ways this can go. The host kills the virus or the the virus kills the host. Either way, people will die." অর্থাৎ, আমরা যদি নিজেরাই জনসংখ্যার নিয়ন্ত্রণ না করি, তাহলে সেটা হতে পারে দু'ভাবে। যেমন- হয় হোস্ট (মানুষ) ভাইরাসকে মারবে না হয় ভাইরাস (হোস্ট) মানুষকে মারবে। মানে যেকোনো ভাবেই হোক মানুষ মারা পড়বেই। এমন বক্তব্য যা ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে একধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। 


আমরা যারা হলিউড সহ রাশিয়ান, চাইনিজ, কোরিয়ান সহ অন্যান্য ভাষার মুভিগুলো দেখি অথবা আজ নেটফ্লিক্সের দুনিয়ায় ও ভাইরাস কিভাবে জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করবে সে নিয়ে প্রচুর মুভি ও সিরিজ দেখি। যেমন- কোরিয়ান সিরিজ- The Kingdom (2019-2020)। আর এসব মুভি/সিরিজের মাধ্যমে আমাদেরকে আগামির ভাই(রাসময়) পৃথিবী সম্পর্কে ধারণা দেয়া হচ্ছে। দেশি-বিদেশি মিডিয়া ঘাটাঘাটি করে কয়েকটি ষড়ষন্ত্র তত্ত্ব দেখা যায়, যেমন- New World Order, Agenda-21, SDGs, Depopulation & Vaccination ইত্যাদি। আবার অনেকেই স্যাটানিজম, দাজ্জাল ও এলিয়েনিজম এর পক্ষেও কথা বলেন। 


আমরা যদি একটু ভিন্নভাবে ভাবি তাহলে দেখবো, করোনাভাইরাস আমাদের বৈশ্বিক পাপের শাস্তি। আমরা যেভাবে প্রতিনিয়ত এই অসহায় পৃথিবীর বুকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছি, ধ্বংসলীলা চালাচ্ছি, দূষণ করছি, গ্রীণ হাউজ গ্যাসের বৃদ্ধি ঘটাচ্ছি; হয় আমরা ধ্বংস হবো না হয় এই পৃথিবী। কিছুদিন পূর্বেও পৃথিবীর ফুসফুস পুড়ছিল, অন্যদিক এন্টার্কটিকার বরফ ক্রমাগতই গলছে। বিজ্ঞানীরা বহুদিন থেকেই আমাদের সতর্ক করে আসছে— জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে, নয়তো পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে। সত্যিকারার্থে এখন হয়েছেও তাই। পৃথিবীর মানুষ এতবেশি প্রকৃতিবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়েছে যে এমন একটা বৈশ্বিক গজবের আশঙ্কা অনেক দিন থেকে করছিলেন বিশেষজ্ঞরা। তারা মানুষকে বার বার সাবধান করেছেন। সতর্ক হতে বলেছেন। কিন্তু, কেউ কথা শোনেনি। রাজনীতিকরা, ধর্মনেতারা ধারাবাহিকভাবে অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন।

এক্ষেত্রে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের বিশেষজ্ঞ ও ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়্যার এর রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জোয়ান মিলার বলেন, 


"বর্তমানে যেসব ব্যক্তিরা নিয়ন্ত্রণের একটি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন; এমন লোকেরা যাঁরা চাকরি হারিয়েছেন, যাদের বাড়িতে বাচ্চা রয়েছে কিন্তু তারা বাচ্ছাদের সাথে উপহাস / আনন্দ বা সময় কাটানোর চেষ্টা করছেন কিন্তু তারা মোটেও অভ্যস্ত না। আবার, যে কেউ এই বিশ্বব্যাপী মহামারীর বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণের অভাব বা অনিশ্চয়তার তীব্র বোধ অনুভব করছেন তার কিছুটা নিয়ন্ত্রণ পুনরায় অর্জনের উপায় হিসাবে সম্ভাব্য ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলিতে বিশ্বাস করার সম্ভাবনা বেশি।" 


অর্থাৎ এই অনিশ্চয়তা পৃথিবীতে নিজেকে কিছুটা শান্তনা দেওয়া খারাপ কিসে। আবার আমরা সবাই এই করোনাতে একদেশ অন্যদেশকে দায়ী করেই যাচ্ছি, কেউ কেউ আবার ভাইরাস যুদ্ধ বা ভাইরাস দিয়ে বিশ্বশাসন ও ব্যবসায়িক এপ্রোচকে বিবেচনায় রাখছেন। যদিও এসব কথা অস্বীকার করাও পাপ হবে। 


কিন্তু কথা হচ্ছে উপরোক্ত যুক্তিগুলোকে যদি সঠিক বলে ধরে নেই, তাহলে একটাই প্রশ্ন ষড়যন্ত্রের প্রবক্তারা কেনোইবা নিজেরা মরতে যাবেন, কেনোইবা উন্নত রাষ্ট্রে আজ এর ব্যাপকতা বেশি, কেনই বা এখনোই প্রতিষেধক তৈরি হচ্ছেনা যদি সেটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতো! উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কাজগুলো সবসময় আগুপিছু ভেবেই হয়, কেউ এতো বোকা না যে- নিজে ও নিজের দেশের মানুষকে মারবো ও অন্যদেশের মানুষকে মেরেই এলিয়েনদের রাজত্ব কায়েম করবো। How Funny! Isn't it Romantic!


অন্যদিকে, চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বারবার হতাশ হয়েই ফিরছে নোভেল করোনার প্রতিষেধক / ভ্যাকসিন তৈরি করতে গিয়ে। আবার, মহামারির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ৪৩০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশতাধিক মহামারির লিখিত তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়, যাদের বেশিরভাগই ছিল প্লেগ ও ফ্লু জনিত। তবে ষোড়শ থেকে একবিংশ শতাব্দি পর্যালোচনা করলে আমরা দেখি, প্রতি শতাব্দিতেই ভয়ংকর ধরণের মহামারির আবির্ভাব ঘটেছিল, যেমন- ১৫১৯ (স্মলফক্স-মৃত্যু-আশি লাখ), ১৬৩৩ (স্মলফক্স-মৃত্যু-দুই কোটি), ১৭৯৩ (ইয়োলো ফক্স-মৃত্যু-৪৫ হাজার), ১৮৬০ (প্লেগ-মৃত্যু-১কোটি ২০লাখ), ১৯১৮ (ইনফ্লুয়েঞ্জা-মৃত্যু-দুই কোটি), ২০০৯ (সোয়াইন ফ্লু-মৃত্যু- প্রায় ৬ লাখ), ২০২০ (করোনাভাইরাস-মৃত্যু-প্রায় ৪লাখ; তবে এটা এখনো চলমান)। 


বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সম্মেলন বা কপ(১-২৫) এর তেমন কোন সফলতা দেখা যায়নি; তাইতো এই বিষয়ে সচেতনা বৃদ্ধিতে গত বছরব্যাপী আন্দোলন শুরু করে সুইডিশ শিক্ষার্থী গ্রেটা টুনব্যার্গ৷ প্রতি শুক্রবার স্কুলে না গিয়ে সুইডিশ সংসদের সামনে বসে আন্দোলন করতেন তিনি৷ তাঁর এই আন্দোলন একসময় সারা বিশ্বের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে৷


সার্বিক দিক বিবেচনায় বিশ্বাসীরা মনে করেন, এটা ঈশ্বরের আশীর্বাদ। অর্থাৎ পৃথিবীতে যখনই পাপাচার বেড়ে যায়, তখনই ঈশ্বর নানা রকম দূর্যোগ দিয়ে পৃথিবীবাসিকে ধ্বংস করে থাকে। মুসলিমদের সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থে এইরকম নানা উদাহরণ রয়েছে, যেমন- ফেরাউন, শোয়াইব (আ:), লুত (আ:), হূদ (আ:), সালেহ (আ:) ও নূহ (আ:) এর সম্প্রদায়। এই নিয়ে হাদিস শরিফ থেকে পাই 'যখন কোনো কওমের (জাতি) মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা তা প্রকাশ্যেও করতে শুরু করে তবে তাদের মাঝে দুর্ভিক্ষ ও মহামারি ব্যাপক আকার ধারণ করে, যা তাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে ছিল না।’ (ইবনু মাজাহ, আসসুনান : ৪০১৯)।


পরিশেষে বলা যায়, দিন দিন যে হারে মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে ও মারা যাচ্ছে; অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এর দিকে যাত্রাকেই ঈশ্বরের লীলা ছাড়া কী বলা যায়! ঈশ্বর আমাদের শাস্তি দিচ্ছেন হয়তো, হয়তো একদিন তিনি আমাদের ক্ষমা করবেন। তবে আমরাও পৃথিবী নামক গ্রহের উপর অত্যাচার বন্ধ করতে হবে, না হয় প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিতে কালক্ষেপণ করবেনা। হয়তো আরো ভয়ংকর কোন বিপদ আমাদের গ্রাস করে ফেলবে, যেমনটা এখনকার মুভি-সিরিজে দেখানো হয়। আশাকরি, হয়তো একদিন আগের মতো কোলাহলময় পৃথিবীতে আমি, আপনি একসাথ হবো। সে পর্যন্ত ধৈর্য্য ধরুন, বাসায় থাকুন, নিরাপদে থাকুন।


_মাহিন/সমাজকর্ম/জবি

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url